Home খেলা ভারতকে কাঁদিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ

ভারতকে কাঁদিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ

6
0
SHARE

আগ্রাসী ইনিংসে গ্যালারি উত্তাল করা রোহিত শর্মার ক্যাচটা ধরে যখন ট্রেভিস হেড মোতেরায় নামিয়েছেন পিন পতন নীরবতা। ধারাভাষ্য কক্ষে ইয়ান স্মিথ বলে উঠলেন, ‘এটাই টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে’। তখন ১০ ওভারে ভারতের রান ৮০। ভারতের পুঁজি কম হওয়ার পেছনে রোহিতের এই আউট পরে হয়েছে বড় প্রভাবক। তবে হেড আসল কাজ করেছেন ব্যাটিংয়েই। ৪৭ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে কেঁপে উঠা দলকে টেনে চ্যাম্পিয়ন বানাতে বাঁহাতি ওপেনার খেললেন ঠান্ডা মাথায় খেললেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। চরম হতাশার মাঝেও এক পর্যায়ে ভারতীয় দর্শকরা দাঁড়িয়ে তালি দিলেন তাকে।
আহমেদাবাদ শহর লোকে লোকারণ্য! আয়োজক ভারত ফাইনালে ওঠায় এমনটা হবারই ছিল। নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম যে জন সমুদ্রে রূপ নেবে এটা অনুমেয়ই ছিল। সকাল থেকে আসা ভারতীয় দর্শকে পুরো গ্যালারিতে ছিল নীলের সমুদ্র। সেখানে হলুদ জার্সি খুঁজে পাওয়াটা একটু দুষ্করই বটে। তবুও কয়েকজন যে ছিল না তা বলার সুযোগ নেই। গ্যালারি এমন একপাক্ষিক হবে সেটা আগে থেকেই জানতেন প্যাট কামিন্স। ম্যাচের আগের দিন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বলেছিলেন, এমন ভরা গ্যালারিকে চুপ করিয়ে দেয়ার চেয়ে তৃপ্তির কিছু নেই। বিশ্বকাপ জুড়ে দাপটের সঙ্গে প্রতিটি ম্যাচ জয়ে অপ্রতিরোধ্য ভারত ফাইনালে পেয়েছিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে। টানা দশ জয়ে ফাইনালে আসা দলটি ঘরের মাঠে আহমেদাবাদে ১ লক্ষ ৩২ হাজার সমর্থকদের সামনে বিশ্বকাপ জয়ের হুংকার দিয়েছিল। তবে ক্রিকেট বিশ্বের সকল বিশ্লেষক থেকে ধরে ভক্তদের শিরোপা জয়ের ‘ফেবারিট’ তকমা পাওয়া ভারতকে নিজেদের জাত চিনিয়ে ৭ উইকেটের জয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতল অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের দেওয়া ২৪১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতে দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে হোঁচট খেলেও ট্রাভিস হেডের বিধ্বংসী শতকে ৪২ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটের জয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো অজিরা।

ভারতের ১ লাখ ৩০ হাজার দর্শককেও নীরব বানিয়ে ফেলার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিলেন কামিন্স। টস জিতে একটু পেরেছিলেনও বটে। অস্ট্রেলিয়া যখন টস জিতল তখন পুরো গ্যালারি যেন নীরব হয়ে গিয়েছিল। তবে ভারত ব্যাটিংয়ে নামতেই বদলে গেল চিত্র। রোহিত শর্মার আক্রমণাত্বক ব্যাটিং পুরো গ্যালারিকে আবারও জাগিয়ে তুলে। তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ভারতীয় দর্শকদের। দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে ভারত। বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুলের হাফ সেঞ্চুরি খানিকটা স্বস্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত আক্ষেপে মোড়ানো ব্যাটিংয়ে স্বাগতিকরা থামে মাত্র ২৪০ রানে। লক্ষ্যটা খুব বড় ছিল না অস্ট্রেলিয়ার জন্য।
তবুও শুরু থেকেই আক্রমণ করায় মনোযোগী ছিল তারা। সেটা করতে গিয়ে পঞ্চাশের আগেই তিন উইকেট নেই অজিদের। তখন যেন ২৪০ রানই অনেক মনে হচ্ছিল তাদের জন্য। তবে সেটা মনে হওয়ার আগেই দূরে ঠেলে দিয়েছেন ট্রাভিস হেড। দল চাপে থাকলেও ভারতীয় বোলারদের বিপক্ষে বাঁহাতি এই ওপেনার ছিলেন দুর্দান্ত। হেডকে যথার্থ সঙ্গ দিয়েছেন মার্নাস ল্যাবুশেন। সময় যত বেড়েছে হেডের আক্রমণাত্বক ব্যাটিংয়ের প্রতাপ ততই বেড়েছে। তাতে করে পাত্তা পায়নি স্বাগতিকরা। হেডের সেঞ্চুরি এবং ল্যাবুশেনের হাফ সেঞ্চুরিতে ভারতকে স্তব্ধ করে নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জিতল অস্ট্রেলিয়া। কামিন্সের দলের কাছে ৬ উইকেটে হেরে তৃতীয় শিরোপা হাতছাড়া করল ভারত।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই ওয়ার্নারের ক্যাচ যায় স্লিপ অঞ্চলে। তবে সেখানে থাকা বিরাট কোহলি ও শুভমান গিলের ভুলে সেটি বাউন্ডারি হয়ে যায়। সেই ওভারেই আরো দুই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ১৫ রান তুলে দুই অজি ওপেনার। ২৪১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভারেই ১৫ রান তুলে উড়ন্ত সূচনার ইঙ্গিত দেয় ট্রেভিস হেড ও ওয়ার্নার। তবে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই মোহাম্মদ শামির বলে সাজঘরে ফিরেন ওপেনার ওয়ার্নার।
শামির বলে ডাউন উইকেটে এসে খেলতে গিয়ে বিরাট কোহলির হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন এই বাঁহাতি ওপেনার। ৩ বলে ৭ রান করে ফিরেন ওয়ার্নার। এরপর দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে নেমে উড়ন্ত সূচনা করেন মিচেল মার্শ।
তবে ইনিংসের পঞ্চম ওভারে জাস্প্রিত বুমরার বলে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন মার্শ। এরপর ক্রিজে নেমে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি স্টিভেন স্মিথ। বুমরার সপ্তম ওভারে লেগ বি ফোরের ফাঁদে পড়েন এই ডানহাতি ব্যাটার। দলীয় ৪৭ রানে ৩ উইকেট হারানো অজিরা চতুর্থ উইকেট জুটিতে ম্যাচে ফিরে।

ট্রাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশেন মিলে ইনিংসের ২০ তম ওভারে দলীয় শতরান পূরণ করেন। এরপর ভারতীয় বোলারদের উপর চড়াও হন অজি ওপেনার ট্রাভিস হেড। লাবুশেনকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণাত্মক ক্রিকেটীয় শট খেলে স্বাগতিকদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন হেড।
ধারাবাহিক আক্রমণে ৯৫ বলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজের শতক তুলে অনন্য এক কীর্তি গড়েন অজি এই ওপেনার। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও সেবার কেউই শতকের দেখা পায়নি। তবে ১৬ বছর অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে মনে করিয়ে দিয়ে ম্যাচ জয়ী এক শতক হাঁকান হেড।
অজি এই বাঁহাতি ওপেনারের শতকেই ইনিংসের ৩৪তম ওভারে ভারতীয়দের কাঁদিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ভীত গড়ে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। শেষদিকে শতকের পূরণের পর আরো মারমুখী হন হেড। ১২০ বলে ১৩৭ রানের দানবীয় ইনিংস খেলে অজিদের শিরোপা নিশ্চিত করে শেষদিকে মাঠ ছাড়েন তিনি। হেডের শতকে ৪২ বল হাতে রেখেই ৪৩তম ওভারে ৬ উইকেট হাতে রেখে ম্যাচ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া। এই জয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা জিতল অজিরা।
এর আগে, টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে শুরুটা ভালোই করেছিলেন রোহিত শর্মা। তবে ভারতের অধিনায়ককে সঙ্গ দিতে পারেননি শুভমান গিল। মিচেল স্টার্কের শর্ট অব লেংথ ডেলিভারিতে সামনের পায়ের উপর ভর করে পুল করতে গিয়ে অ্যাডাম জাম্পার হাতে ক্যাচ দিয়েছেন তিনি। গিলের ব্যাট থেকে এসেছে ৪ রান। গিল ফিরলেও রানের চাকা সচল রাখেন কোহলি এবং রোহিত। ইনিংসের অষ্টম ওভারে এসে প্রথমবার আক্রমণে স্পিনার হিসেবে ম্যাক্সওয়েলকে নিয়ে আসেন প্যাট কামিন্স।

প্রথম ওভারে সাফল্য না পেলেও নিজের দ্বিতীয় ওভারে উইকেট এনে দেন ম্যাক্সওয়েল। ডানহাতি এই অফ স্পিনারের পরের ওভারে টানা দুই বলে ছক্কা এবং চার মারেন রোহিত। পরের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে আবারও উড়িয়ে মারতে গিয়েছিলেন ভারতের অধিনায়ক। তবে ব্যাটে-বলে ঠিকঠাক না হওয়ায় ফিরে যেতে হয় হেডের দুর্দান্ত ক্যাচে। দারুণ ব্যাটিং করা রোহিতের ব্যাট থেকে এসেছে ৩১ বলে ৪৭ রান। চারে নেমে দ্রুতই ফিরে গেছেন শ্রেয়াস আইয়ার।
কামিন্সের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেছেন ৪ রান করে। মাত্র ৫ বলের ব্যবধানে ২ উইকেট হারানোর পর থেমে যায় ভারতের রান তোলার গতি। সাবধানী ব্যাটিংয়ে ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন রাহুল এবং কোহলি। বাউন্ডারি না পেলেও নিয়মিত সিঙ্গেল নিতে থাকেন তারা দুজন। এদিকে ৫৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। এদিকে ৯৭ বল পর বাউন্ডারির দেখা পেয়েছে ভারত।

হাফ সেঞ্চুরির পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি কোহলি। ৬৩ বলে ৫৪ রান করা কোহলিকে থামিয়েছেন কামিন্স। তাকে বোল্ড করেন অজি অধিনায়ক। এরপর রাহুলকে সঙ্গ দিতে আসেন রবীন্দ্র জাদেজা। তবে এই জুটিকে থিতু হতে দেননি জশ হ্যাজেলউড। ৯ রান করা জাদেজাকে তিনি উইকেটের পেছনে জশ ইংলিসের ক্যাচ বানিয়েছেন।
রাহুল হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পর ৬৬ রান করে ফিরেছেন। তাকে আউট করে স্টার্ক। এই অজি পেসারের গুড লেন্থের বলে রিভার্স শট খেলতে গিয়ে আউট সাইড এজ হয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। এরপর মোহাম্মদ শামিকেও আউট করেছেন স্টার্ক। খানিক বাদে অ্যাডাম জাম্পার শিকার হয়ে জসপ্রিত বুমরাহ এলবিডব্লিউ হলে ভারতের ইনিংস আর বেশিদূর এগোতে পারেনি। ভারতের শেষ ভরসা সূর্যকুমার যাদব আউট হন মাত্র ১৮ রান করে। ফলে আড়াইশ রানের কোটা পার হতে পারেনি ভারত।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত- ২৪০/১০ (৫০ ওভার) (রোহিত ৪৭, গিল ৪, কোহলি ৫৪, রাহুল ৬৬; স্টার্ক ৩/৫৫)
অস্ট্রেলিয়া- ২৪১/৬ (৪৩ ওভার) (ওয়ার্নার ৭, মার্শ ১৫, হেড ১৩৭, ল্যাবুশেন ৫৮*)