‘বিশ্বে মানুষের অনেক ধরনের শত্রু আছে, তবে এই মুহূর্তে মানুষের জন্য ছোট আকারের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে মশা। অনেক ভয়ানক রোগের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় মশাবাহিত রোগে। তাই এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতে হবে। যদিও আমাদের দেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব অনেক কমে গেছে, আশা করি ২০৩০ সালের আগেই আমরা বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে ম্যালেরিয়া মুক্ত করতে সক্ষম হবো। এ জন্য যা যা করা দরকার আমরা সেটা অবশ্যই করবো।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক আজ সোমবার বিকালে কালের কণ্ঠ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক গোলটেবিল আলোচনায় এ কথা বলেন। সরকারের জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কালের কণ্ঠ ও ব্র্যাক আয়োজিত ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে অগ্রগতি ও ভবিষ্যত করণীয়’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনায় মন্ত্রী প্রধান অতিথি ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, ম্যালেরিয়া নির্মূলে অনেক কাজ হয়েছে, উন্নতি হয়েছে। একজন মানুষও যেন মারা না যায় সেটিই আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষে ম্যালেরিয়া নির্মূলে ক্রস বর্ডার ট্রান্সমিশন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া একটি টাক্সফোর্স গঠনও দ্রুত সময়ের মধ্যেই করে ফেলতে হবে।
তিনি বলেন, দক্ষজনবল তৈরি ও নিয়োগ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা, প্রয়োজনীয় কীটনাশকযুক্ত মশারিসহ অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ ও সবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। এগুলো ব্যবস্থা করা যাবে।
ডেঙ্গু প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় রাতারাতি ব্যবস্থা নিয়ে আমরা সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছি। যদিও প্রশংসার তুলনায় সমালোচনা বেশি হয়েছে। তবে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশের মত হয়তো আরও বড় সংখ্যার প্রাণহানি ঘটতে পারতো। তবু আমরা একজনের মৃত্যুও দেখতে চাই না। সে জন্য আমাদের কার্যক্রম সব সময়ই অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে যে ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যতবারই তাঁর নেতৃত্বে সরকার থাকে ততবারই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির সাফল্যধারায় স্বাস্থ্যখাতে একের পর এক অর্জন আসে। এই সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আমাদের সারাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীরা এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনরাত কাজ করেছে। নয়তো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু এতো সহজে হয়তো নিয়ন্ত্রণে আনা যেতো না। উন্নত অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা দক্ষতার সঙ্গে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়েও আমাদের অনেক কাজ হয়েছে ও হচ্ছে। এতেও আমরা সফল হবো। পার্বত্য অঞ্চলের যে কয়টি জেলায় ম্যালেরিয়া আছে সেগুলো আমরা ভালো ভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি। ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যু অনেক কমে এসেছে। আশা করি নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা এ ক্ষেত্রেও সাফল্য পাবো।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, একটা সময় এই বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কলেরা, কালাজ্বর, বসন্ত-এই ধরণের বিভিন্ন রোগগুলোতে প্রচুর মানুষের জীবনহানি হতো। সেই অবস্থা থেকে কালেক্রমে আমরা অনেকটা এগিয়ে এসেছি। অনেকগুলো রোগ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। যক্ষ্মা এখন একেবারেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে, বসন্ত প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে, কলেরাকেও খুব সহজভাবে এখন মোকাবেলা করতে পারি। আগের মতো আর প্রাণহানি হয় না। ম্যালেরিয়া শহর ও গ্রামাঞ্চলে সেভাবে নেই তবে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনো বেশি। ব্যাপকভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় সেখানকার মানুষ।
স্বাগত বক্তব্যে কালের কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল বলেন, ম্যালেরিয়া সারা দেশে নেই বলে আমরা এটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। পার্বত্য অঞ্চলে এর ভয়াবহতা রয়েছে। এক সময় ডেঙ্গু স্বল্প পরিমাণে ছিল। ধীরে ধীরে সেটি বেড়ে কী আকার ধারণ করেছিল তা আমরা সবাই জানি। সুতরাং, মহামারি আকার ধারণ করার আগেই ম্যালেরিয়া সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। তবেই সেটি ডেঙ্গুর মতো ব্যাপকতা লাভ করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানের সহ-আয়োজক ও আরেক স্বাগত বক্তা, ব্র্যাকের কমিউনিকেবল ডিজিজেস ও ওয়াশ কর্মসূচি পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, আমি মনে করি বর্তমানে যেকোন তথ্য ছড়িয়ে দিতে মিডিয়ার বিকল্প কিছু নেই। তাই ম্যালেরিয়া বিষয়ক তথ্য গণমাধ্যমের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এর ফলে মানুষ ম্যালেরিয়া সম্পর্কে তথ্য জানার মাধ্যমে সচেতন হবে।
তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কাজে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বিশেষ করে জনবল, কীটনাশকযুক্ত মশারি ও অন্যান উপকরণেরও সংকট আছে। সেগুলোর ব্যবস্থা দ্রুত করা দরকার।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান ম্যালেরিয়া পরিস্থিতির ওপর তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। এসময় তিনি জানান, দেশের মোট ১৮ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন মানুষ এখনও ম্যালেরিয়ার ঝুকিতে রয়েছে। তবে এখন মাত্র ১৩টি জেলার ৭১ উপজেলায় এর বিস্তার আছে। ২০১৮ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৫২৩জন আর মারা যায় ৭জন। এছাড়া উচ্চমাত্রার ম্যালেরিয়া প্রবন এলাকায় আক্রান্তের হার ৯১ শতাংশ আর মারাত্নক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সর্বজনিন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যপূরণ অনুসারে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ ম্যালেরিয়া নির্মূলের পথে এগিয়ে চলছে। এতে আমাদের সফল হতেই হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশের মেডিক্যাল অফিসার মিয়া সেপাল বলেন, বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া নির্মূলে সঠিক পথেই চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে।
অনুষ্ঠানে এছাড়াও আলোচনা করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক এনপিও-ভিবিডি ডা. এ মান্নান বাঙ্গালী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. দিলরুবা সুলতানা, রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর’র প্রিন্সিপল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. এ এস এম আলমগীর, ব্র্যাকের কর্মসূচি প্রধান (ম্যালেরিয়া) ডা. শায়লা ইসলাম, সাবেক চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার তৌহিদ উদ্দিন আহম্মেদ, আইসিডিডিআরবির এসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম, বসিসিএম সমন্বয়কারি মনোজ কুমার বিশ্বাস, সাজিদা ফাউন্ডেশনের উর্ধতন পরিচালক মো. ফজলুল হক, সমাজ কল্যান ও উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা।



