সোহেল সানি
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, “A gentleman is what his tailor makes of him.”
দর্জি যদি ভদ্রলোক তৈরি করতে পারেন, তা’হলে একটি দেশও তৈরি সাধারণ মানুষের হাতে,অতি মানবের হাতে নয়।
রাজনীতি দোষণীয় নয়,বরং একটি পবিত্র ব্রত। ব্রতগ্রহণের প্রেরণা প্রাণে জন্মে সাধারণ মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষা থেকেই।
রাজনীতির চোহারা দেখে মনে হয়,যাঁরা রাজনীতিকে ভাগ্যোন্নতির অবলম্বন বলে ভাবেন, তাঁদের উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করা, কন্ট্রাক্টরি করা, লাইসেন্স বা পারমিটের জন্য উমেদারি করা, কিন্তু রাজনীতি করা নয়। রাজনীতির একটিমাত্র অপাপবিদ্ধ উদ্দেশ্য, দেশ ও মানুষের কল্যাণ। কল্যাণসাধনের পথ বিঘ্নসঙ্কুল। এ পথে নিত্য উদ্যত দমন ও পীড়নের খরগ। গতানুগতিক বা প্রথাসিদ্ধ রাজনীতি নয়- সত্যিকার রাজনীতির বিঘ্নসঙ্কুল পথে যাঁরা অভিযাত্রী,তাঁরা মহাপ্রাণ, তারা শ্রদ্ধেয়। ক্ষুদ্রস্বার্থের বিচারবোধ বা নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ পন্ডিতি বুদ্ধির চুলচেরা তর্কের মাধ্যমে তাঁদের কল্যাণবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের পরিমাপ সম্ভব নয়। গণকল্যাণের রাজনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতি এক নয়। রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবে ক্ষমতালাভের উপায়, কিন্তু উদ্দেশ্য নয়। যাঁরা একে উদ্দেশ্য করে তোলেন তাঁরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, গণকল্যাণের রাজনীতি করেন না।
বঙ্গবন্ধু দুঃখ-ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় সম্মুখীন হওয়ার মনোবল দেখিয়েছেন বলেই আওয়ামী লীগ এবং জনগণ সৌভ্রাতৃত্বের একই রাখীসূত্রে বাঁধা ছিলো। আওয়ামী লীগে খারাপ লোক নেই এমন অলীক দাবি শেখ হাসিনাও করেন না। তার গর্জনেই এখানে-ওখানে হট্রগোলকারী থাকলেও হট্টগোল সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছেনা। মুষ্টিমেয় অঙ্গ বা সহযোগী নেতার বিরোধিতা কর্পূরের মতো উবে গেছে। দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা বা ভাগ্যনির্দেশকের ভুমিকায় থাকা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দেশপ্রেম, সততা,দুর্জয় সাহস,সদিচ্ছা সর্বোপরি তাঁর সত্যপ্রকাশে দুরন্ত সাহস এবং কঠোর হস্তে দমনের অজস্র দৃষ্টান্ত থাকায় ভরকে গেছে দুস্কর্মকারীরা।রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিভিন্নস্থানে নামীদামী ক্লাবগুলোতে গড়ে ওঠা “ক্যাসিনো” সমাচারে জনগণের মনঃসংযোগ ক্ষোভের উদ্রেক করলেও আবার সেই জনগণকেই উপলব্ধি করতে হবে যে,এই রাজনৈতিক-সামাজিক দুস্কর্মে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের রাশ টেনে ধরার কাজটি সয়ং প্রধানমন্ত্রীই করেছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা না থাকলে মতিঝিলের ক্লাবপাড়াসহ কলাবাগান-ধানমণ্ডি, গুলশান-বনানীসহ ক্রীড়াঙ্গনে মদ-মাদক, অর্থ-অস্ত্রবলে বসা জুয়ার আসরের চাঞ্চল্যকর এসব খবর জানা যেতো না। কেননা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দল ও সরকারি প্রশাসনের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের যোগসাজশে এসব দুস্কর্ম চলে আসছিলো। গ্রেফতারকৃতদের বয়ানে উদঘাটিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন ও সংসদের হুইপ শামসুল হকের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আত্মপক্ষ সমর্থন করে গণমাধ্যমে সম্পৃক্ততার বিষয়ে যে বয়ান দিয়েছেন, তা অস্পষ্ট, অসংলগ্ন এবং যার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। হুইপ শামসুল হক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড়ের বিষয়ে যেসব উক্তি করেছেন তাও অগ্রহণযোগ্য। তিনি ফুটবল-ক্রিকেটসহ ক্রীড়ামুলক কর্মকাণ্ডকে হালাল করতে চেয়েছেন জুয়ার টাকা দিয়ে। রাশেদ খান মেনন পাক্কা পলিটিক্স করা লোক সম্প্রতি বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। তিনি সভাপতি মতিঝিলের এমন একটি ক্লাবে ক্যাসিনোর আবিষ্কার হলে।
এদিকে আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা ও যুবলীগের একাধিক নেতা গ্রেফতার হওয়ার প্রেক্ষিতে দেয়া বিবৃতি-বক্তৃতা নিয়ে মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অভিযান চালালেও যুবলীগ চেয়ারম্যান কঠোর ভাষায় এসব অপকর্মের জন্য পাল্টা প্রশাসনকে দায়ী করেন। ওমর ফারুক চৌধুরী শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বোন জামাই হওয়ায় প্রশাসন বিব্রতবোধ করলেও পাল্টা জবাবদান থেকে বিরত রয়েছে। অবশ্য যুবলীগ চেয়ারম্যান তাঁর অবস্থান ত্যাগ করেছেন। অবশ্য কতিপয় নেতার দুষ্কর্মের জন্য যুবলীগের মতো একটি মাঠপর্যায়ের শক্তিশালী সংগঠনকে দায়ী করা যায়না। যে কোন সংগঠনেই দুষ্টু লোক খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে যাদের নাম গণমাধ্যমে এসেছে তাদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থারও কেউ কেউ চক্রাকারে জড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারেন। এজন্য অভিযুক্তদের বিষয়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়াই হবে সংগঠনের জন্য কল্যাণ। অভিযুক্তদের দুষ্কর্মে জড়িয়ে যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা স্বার্থসিদ্ধি করেছেন রাজনৈতিক মহলের এসব কানাঘুষা রয়েছে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকায় থাকা যুবলীগকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্য কোন বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্র কিনা সেটাও প্রধানমন্ত্রী আমলে নেয়া প্রয়োজন। যুবলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে।১৯৭৩ সালের ১১ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম যুবসংগঠক শেখ ফজলুল হক মনির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠালাভ করে। শেখ মনি চেয়ারম্যান এবং মুক্তিযুদ্ধের খলিফাখ্যাত ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকীকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবলীগের আত্মপ্রকাশ। ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগ দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় স্বাধীনতার অন্যতম নিউক্লিয়াস ও ছাত্রলীগের এককালীন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খানকে কেন্দ্র করে মেজর এমএ জলিলকে সভাপতি, ডাকসু ভিপি ও ছাত্রলীগের এককালীন সাধারণ সম্পাদক আসম আব্দুর রবকে সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজকে যুগ্ম সম্পাদক করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মূল ছাত্রলীগ ভেঙ্গে পাল্টা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বসানো হয় আফম মাহবুবুল হক ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। জাসদের সশস্ত্র রাজনীতি এবং বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের নানা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের এককালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি ও ছাত্রলীগের এককালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যুবলীগের জন্ম। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ডাকসু বঙ্গবন্ধুর সদস্যপদ
সোহেল সানি
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
বাংলাদেশ প্রতিদিন



